ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ৪ হাজার ৩০০ জন। ধসে পড়েছে অসংখ্য ভবন।
শুক্রবার (২৬ জুন) ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি খালি হাতেও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।কারাকাসের পশ্চিমে শত বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার দুই দিন পর বিপর্যস্ত দেশটিতে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণ সহায়তা পৌঁছাতে শুরু করেছে।
ভেনেজুয়েলার লাগুয়াইরা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।জাতীয় পরিষদের প্রধান হোর্হে রড্রিগেজ বৃহস্পতিবার জানান, ধসে পড়া ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপের নিচে দুই শতাধিক মানুষ আটকা পড়েছেন।ধসে পড়া একটি ভবনের সামনে উদ্ধারকর্মীরা বড় হাতুড়ি দিয়ে কংক্রিট ভাঙছিলেন। এএফপির ভিডিওতে দেখা যায়, জীবিতদের কোনো শব্দ শোনার জন্য তারা সবাইকে ‘সম্পূর্ণ নীরবতা’ বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্লোস আলভারাদো জানান, মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ৪ হাজার ৩০০ জন।উদ্ধারকাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টা পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে মরদেহ দেখা গেছে। আটকে পড়ে আহত হওয়া অনেকের ক্ষেত্রেই সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ত্রাণ কার্যক্রম তদারকির জন্য দেশটির এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে পৌঁছেছেন।বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উদ্ধারকারী দল, অর্থ ও ত্রাণ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা দুটি যুদ্ধজাহাজ, পরিবহন বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করছে। পাশাপাশি ১৫ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা দিচ্ছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কারাকাসের উত্তরের লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে আম্পারো দেল জিউদিসে খালি হাতে কংক্রিটের বিশাল স্তূপ সরিয়ে তার ছেলেকে খুঁজছিলেন।
হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এখানে অনেক পাথর। খালি হাতে এগুলো সরানো অসম্ভব।’অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা এএফপিকে জানিয়েছেন, কয়েক ঘণ্টা ধরে সাহায্যের জন্য চিৎকার করার পরও এক কিশোরীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরে তার মৃত্যু হয়।
৪৮ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা দানি রিজো বলেন, ‘আমাদের আরও মানুষের প্রয়োজন। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রয়োজন। তারা এলে আমরা তাকে বের করে আনতে পারব।’মৃতদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন দুই স্প্যানিশ, একজন পর্তুগিজ, দুই ব্রাজিলীয়, ইতালি ও ভেনেজুয়েলার দ্বৈত নাগরিক একজন এবং চীনের দুই নাগরিক।
স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, দেশটির আরও ৮০ নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।অন্তর্র্বতীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ বৃহস্পতিবার লা গুয়াইরা সফর করেন। এর আগে অঞ্চলটিকে ‘দুর্যোগ এলাকা’ ঘোষণা করা হয়।
ভেনেজুয়েলায় আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটির পরিচালক নিকোল কাস্ত পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে বর্ণনা করেছেন।বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সহায়তার প্রস্তাব আসছে। সুইজারল্যান্ড, স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল ও মেক্সিকো বিশেষজ্ঞ ও উদ্ধারকারী দল পাঠাচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এর আগে ‘পুরো সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে’ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ‘এটি হবে বড়, দ্রুত এবং কার্যকর।’চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও আটক করার পর থেকে তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় ওয়াশিংটনের সম্পৃক্ততা ঘনিষ্ঠভাবে বজায় রয়েছে।
চীন, ভারত, ব্রাজিল এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে পোপ লিও চতুর্দশ দেশটির জন্য প্রাথমিকভাবে এক লাখ ইউরো সহায়তা পাঠিয়েছেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ দুর্যোগে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে জাতিসংঘ ভেনেজুয়েলাকে সহায়তার অঙ্গীকার করেছে।উদ্ধার কার্যক্রমে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে লা গুয়াইরার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।স্পেন, ব্রাজিল, চীন, ইতালি ও পর্তুগালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের যথাক্রমে দুইজন, দুইজন, দুইজন, একজন এবং একজন নাগরিক এ ভূমিকম্পে নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেশী কলম্বিয়াতেও ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে রাজধানী বোগোতার বিভিন্ন ভবন থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়।ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূল ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ১৯৯৭ সালের পর সেখানে আর কোনো বড় ভূমিকম্প হয়নি। ওই বছরের ভূমিকম্পে ৭৩ জন প্রাণ হারান। এর আগে ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পে নিহত হন ২৩৬ জন।
বুধবারের ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পটি ছিল ১৯০০ সালের ২৯ অক্টোবরের পর সবচেয়ে শক্তিশালী। ১৯০০ সালে উপকূলের বাইরে আঘাত হানা ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৭।
ব্রাজিলের ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, দেশটির উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি শহরেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসেও আতঙ্ক ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখা গেছে। অনেক মানুষ সারা রাত রাস্তায় কিংবা নিজেদের গাড়িতে কাটিয়েছেন।