সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৮ অপরাহ্ন

আদালতের রায়ে বাতিল হাজারো অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / ১৭ মোট শেয়ার
হালনাগাদ : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা দেওয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আদালত বাতিল করলেও হাজার হাজার আবেদনকারী এখনো নিজ নিজ দেশে আটকে রয়েছেন। গত ২১ আগস্ট ফেডারেল আদালতের রায়ের পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা স্বীকার করেছে। কিন্তু ভিসা ইস্যুতে অতিরিক্ত যাচাই, নতুন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারছেন না।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনপিআরের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি বাংলাদেশ, পাকিস্তান, কলম্বিয়া, ব্রাজিলসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু স্থগিত করে। প্রশাসনের যুক্তি ছিল, এসব দেশের আবেদনকারীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। মার্কিন অভিবাসন আইনে এই বিষয়টি ‘পাবলিক চার্জ’ নামে পরিচিত। তবে নিষেধাজ্ঞাটি সবার ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থা যাচাই করে নয়, জাতীয়তার ভিত্তিতে কার্যকর করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে এই নীতি চ্যালেঞ্জ করা হয়। গত ২১ আগস্ট বিচারক জেনেট ভার্গাস রায় দেন, এভাবে ৭৫ দেশের নাগরিকদের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা দেওয়া বন্ধ রাখার নীতি আইনসম্মত নয়। আদালত নিষেধাজ্ঞাটি বাতিল করার পাশাপাশি শুধু ওই নীতির কারণে প্রত্যাখ্যাত ভিসা আবেদনগুলো পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেন। বিচারকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছিল।

রায়ের পর ২৮ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ২১ আগস্ট থেকে ৭৫ দেশের নাগরিকদের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু স্থগিত রাখার নীতি আর কার্যকর নেই। তবে একই ঘোষণায় সংস্থাটি জানায়, আবেদনকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন কি না, তা যাচাইয়ের নীতি পর্যালোচনা চলছে। অর্থাৎ আদালতের রায়ে জাতীয়তাভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা বাতিল হলেও আবেদনকারীদের অন্যান্য যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার সময় ২ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষের ইমিগ্র্যান্ট ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াধীন ছিল। তাঁদের মধ্যে মার্কিন নাগরিক ও গ্রিন কার্ডধারীদের স্ত্রী-স্বামী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরাও রয়েছেন। অনেক আবেদনকারীর ভিসা অনুমোদনের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। কেউ কেউ পাসপোর্টে ভিসা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। আদালতের রায়ের পরও তাঁদের অনেকে নতুন সিদ্ধান্ত বা প্রয়োজনীয় নথির অপেক্ষায় রয়েছেন।

এই পরিস্থিতির একটি উদাহরণ মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য ডাস্টিন হফম্যানের পরিবার। একসময় ইরাকে দায়িত্ব পালন করা হফম্যান স্ত্রী গ্লোরিয়া এবং সন্তানদের নিয়ে আর্জেন্টিনায় বসবাস করতেন। পরে সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষার সুযোগ বিবেচনায় পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী কলম্বিয়ার নাগরিক হওয়ায় ৭৫ দেশের ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েন। প্রায় এক বছর ধরে আবেদন প্রক্রিয়া চললেও গ্লোরিয়ার ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখনো ইস্যু হয়নি।

হফম্যান জানিয়েছেন, তাঁদের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে ছায়া এবং ১২ বছর বয়সী সৎসন্তান ইসরায়েল এখনো আর্জেন্টিনায় রয়েছে। মেয়ের বিশেষ শিক্ষাগত প্রয়োজনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে উন্নত সুযোগের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভিসার দীর্ঘসূত্রতায় পরিবার আলাদা থাকতে বাধ্য হচ্ছে। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে একসাথে বসবাসের পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

আদালতের রায়ের পরও হফম্যানের স্ত্রীর কাছে নতুন করে আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ চেয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন কি না, তা যাচাই করতে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে। হফম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও বারবার নতুন শর্ত পূরণের প্রয়োজন হওয়ায় তাঁদের পারিবারিক জীবনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

আমেরিকান ইমিগ্রেশন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত সভাপতি অ্যালেক্সিস অ্যাক্সেলরাড অভিযোগ করেছেন, আদালতের আদেশের পরও প্রশাসন ভিসা ইস্যুর প্রক্রিয়া যথেষ্ট দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিচ্ছে না। তাঁর মতে, কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও আবেদনকারীরা যদি ইন্টারভিউ শেষ করতে বা পাসপোর্টে ভিসা পেতে না পারেন, তাহলে বাস্তবে তাঁদের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তবে প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে আবেদন আটকে রাখছে, এটি আইনজীবীদের অভিযোগ। আদালতের আদেশ অমান্যের বিষয়ে নতুন কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

এনপিআর জানিয়েছে, আগস্টে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বিদেশে অবস্থিত দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোর কর্মকর্তাদের জন্য নতুন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করে। এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য আবেদনকারীদের পাবলিক চার্জসংক্রান্ত ঝুঁকি আরও বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করা। এর ফলে আগে অনুমোদনের পর্যায়ে পৌঁছানো আবেদনগুলোর ক্ষেত্রেও বাড়তি যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। একজন সাবেক মার্কিন কনস্যুলার কর্মকর্তা এনপিআরকে জানিয়েছেন, এত বড় পরিসরে ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত বা ধীরগতিতে পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অস্বাভাবিক।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের ওপরও। কলম্বিয়ার চিকিৎসক ও গবেষক ড. ফার্নান্দো লিজকানো তাঁদের একজন। হৃদরোগ, স্থূলতা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করেন তিনি। বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত ইবি-১এ ক্যাটাগরিতে তাঁর আবেদন ইউএসসিআইএস অনুমোদন করেছে। কিন্তু এরপরও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের চূড়ান্ত ভিসা অনুমোদনের অপেক্ষায় কলম্বিয়ায় অবস্থান করছেন তিনি।

লিজকানো জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বায়োমেডিকেল গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। বিশেষ করে এন্ডোক্রাইনোলজি, মলিকিউলার বায়োলজি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চান তিনি। কিন্তু ভিসা প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। তাঁর ঘটনা দেখিয়েছে, ইউএসসিআইএসের মাধ্যমে একটি ইমিগ্রেশন পিটিশন অনুমোদিত হওয়া এবং বিদেশে মার্কিন দূতাবাস থেকে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা পাওয়া এক বিষয় নয়।

এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এনপিআরকে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিষয়টি এখনো আদালতে বিচারাধীন থাকায় তারা বিস্তারিত মন্তব্য করবে না। সংস্থাটির সরকারি ওয়েবসাইটে অবশ্য নিশ্চিত করা হয়েছে, আগস্টের আদালতের রায়ের পর ৭৫ দেশের ভিসা ইস্যু বন্ধ রাখার নীতি বাতিল হয়েছে। তবে প্রশাসন আবেদনকারীদের আর্থিক স্বনির্ভরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার সম্ভাবনা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্যও এই পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জানুয়ারিতে যে ৭৫ দেশের ওপর ইমিগ্র্যান্ট ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, সেই তালিকায় বাংলাদেশও ছিল। ফলে বাংলাদেশ থেকে ফ্যামিলি-ভিত্তিক কিংবা এমপ্লয়মেন্ট-ভিত্তিক ইমিগ্র্যান্ট ভিসার জন্য আবেদন করা ব্যক্তিরাও নীতিটির আওতায় পড়েছিলেন। আদালতের রায়ের ফলে ওই নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও আটকে থাকা প্রতিটি আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হয়ে যাবে, এমন নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নিষেধাজ্ঞা মূলত ইমিগ্র্যান্ট ভিসার জন্য প্রযোজ্য ছিল। টুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং অন্যান্য নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার ওপর ওই একই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে, এই নীতির কারণে আগে ইস্যু করা বৈধ ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বাতিল করা হয়নি। তবে অন্য কোনো পৃথক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কিংবা আবেদনকারীর ব্যক্তিগত অযোগ্যতা থাকলে তা আলাদাভাবে বিবেচিত হবে।মানচিত্র দেখুন

এনপিআরের প্রতিবেদনে উঠে আসা পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আদালতের রায়ে একটি অভিবাসননীতি বাতিল হওয়া এবং সেই রায়ের সুফল আবেদনকারীদের কাছে পৌঁছানোর মধ্যে বড় ব্যবধান থাকতে পারে। বর্তমানে প্রধান প্রশ্ন হলো, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কত দ্রুত আটকে থাকা আবেদনগুলোর সিদ্ধান্ত দেবে এবং অতিরিক্ত যাচাইয়ের কারণে অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোকে আরও কত দিন আলাদা থাকতে হবে।


এই বিভাগের আরো খবর