চার্জার খোঁজা কিংবা নির্দিষ্ট চার্জিং প্যাডে ফোন ঠিকভাবে বসানোর ঝামেলা কমাতে নতুন ধরনের তারহীন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রযুক্তি তৈরি করছেন দুই বাংলাদেশি গবেষক। নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রিজোলিংক-এর মাধ্যমে ড. সাইদুল আলম চৌধুরী ও ইউশা আরাফ এমন একটি ব্যবস্থা তৈরির কাজ করছেন, যেখানে নির্দিষ্ট একটি ছোট পরিসরের মধ্যে একাধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস তার ছাড়াই চার্জ করা যাবে।
প্রচলিত ওয়্যারলেস চার্জিং ব্যবস্থায় স্মার্টফোন বা অন্য ডিভাইসকে সাধারণত নির্দিষ্ট একটি প্যাডের ওপর সঠিক অবস্থানে রাখতে হয়। রিজোলিংকের স্মার্টপাওয়ারবক্স প্রযুক্তির লক্ষ্য হলো সেই সীমাবদ্ধতা কমানো।এই প্রযুক্তিতে একটি ছোট ত্রিমাত্রিক পরিসরের মধ্যে ডিভাইসের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তিত হলেও চার্জিং চালু রাখা সম্ভব হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে একটি ড্রয়ার বা আসবাবের নির্দিষ্ট অংশকে ‘চার্জিং জোন’ হিসেবে ব্যবহার করে সেখানে ফোন, স্মার্টওয়াচ বা ইয়ারবাড রাখলেই চার্জ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে প্রকল্পটির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিটির নকশা ও প্রোটোটাইপ উন্নয়নে ড. সাইদুল আলম চৌধুরী এবং অধ্যাপক আইগুও প্যাট্রিক হু নেতৃত্ব দিচ্ছেন।স্মার্টপাওয়ারবক্সে আসবাবের ভেতরে পাতলা ও সমতল কয়েলের একটি নেটওয়ার্ক বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কয়েল নিয়ন্ত্রিত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করবে। নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে উপযুক্ত কোনো ডিভাইস শনাক্ত হলে সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।
একই সঙ্গে উন্নত পাওয়ার ইলেকট্রনিকসের মাধ্যমে কোন ডিভাইস চার্জ নিচ্ছে, তার কতটা বিদ্যুৎ প্রয়োজন এবং কীভাবে নিরাপদে চার্জ দেওয়া হবে—এসব নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা থাকবে।গবেষকদের লক্ষ্য হলো, কোনো ডিভাইস চার্জের প্রয়োজন না থাকলে পুরো ব্যবস্থাকে সক্রিয় না রাখা। এতে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচ কমানো এবং চার্জিং ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।তবে প্রযুক্তিটি এখনো গবেষণা ও প্রোটোটাইপ পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে এসেছে—এমন তথ্য নেই।
প্রকল্পটির উন্নয়নে ১ লাখ ১৪ হাজার নিউজিল্যান্ড ডলার অনুদান দেওয়া হয়েছে। অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওয়ারউইক অ্যান্ড জুডি স্মিথ ইঞ্জিনিয়ারিং এনডাওমেন্ট ফান্ড থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।এই অর্থ মূলত স্মার্টপাওয়ারবক্সের প্রোটোটাইপ উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত গবেষণাকে এগিয়ে নিতে ব্যবহার করা হবে।ড. সাইদুল আলম চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
বর্তমানে অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়্যারলেস পাওয়ার প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে পাওয়ার ইলেকট্রনিকস, তারহীন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং চার্জিং ব্যবস্থার দক্ষতা ও নিরাপত্তা।রিজোলিংকের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর দুটি মার্কিন পেটেন্ট রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণাপত্রেও তাঁর কাজ প্রকাশিত হয়েছে।অন্যদিকে, রিজোলিংকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইউশা আরাফ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিষয়ে স্নাতক এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লিগিন্স ইনস্টিটিউটে ডক্টরাল গবেষণায় যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি কৌশলগত কার্যক্রম ও ব্যবসায়িক উন্নয়নের দিকটি দেখছেন।
রিজোলিংকের লক্ষ্য শুধু ফোন বা ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস চার্জ করা নয়। প্রতিষ্ঠানটি ইলেকট্রনিকস নির্মাতা, শিল্পকারখানা এবং বায়োমেডিকেল প্রযুক্তির জন্যও তারহীন বিদ্যুৎ সরবরাহের সমাধান তৈরির সম্ভাবনা দেখছে।স্মার্ট হোম, অফিস ও হাসপাতালের মতো পরিবেশে প্রযুক্তিটির ব্যবহার হতে পারে। যেমন একটি ড্রয়ার বা টেবিলের নির্দিষ্ট অংশ চার্জিং জোন হিসেবে ব্যবহার করা গেলে একাধিক ডিভাইস আলাদা চার্জার ও তার ছাড়াই চার্জ করা সম্ভব হতে পারে। হাসপাতালের বিভিন্ন সেন্সর ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতেও কম তারনির্ভর বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে।তবে প্রযুক্তিটি নিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। স্মার্টপাওয়ারবক্স এমন কোনো ব্যবস্থা নয়, যার মাধ্যমে একটি পুরো ঘরের যেকোনো জায়গা থেকে ফোন চার্জ করা যাবে।
বর্তমান ধারণাটি একটি ছোট ও নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক পরিসরের মধ্যে তারহীন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। প্রযুক্তিটিকে ওয়াই-ফাইয়ের সঙ্গে তুলনা করা হলেও ওয়াই-ফাই যেখানে তথ্যের সিগন্যাল বহন করে, এখানে নিয়ন্ত্রিতভাবে বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহ করা হবে।বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে হলে চার্জিং দক্ষতা, বিভিন্ন ডিভাইসের সঙ্গে সামঞ্জস্য, উৎপাদন খরচ এবং ইলেকট্রোম্যাগনেটিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে সাইদুল ও ইউশার। বিশেষ করে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), স্মার্ট হোম এবং স্মার্ট হাসপাতালের জন্য সাশ্রয়ী তারহীন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরির সম্ভাবনা দেখছেন তাঁরা।গবেষণাগারের প্রযুক্তিকে বাস্তব পণ্য ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলাই রিজোলিংকের মূল লক্ষ্য। স্মার্টপাওয়ারবক্স শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক পর্যায়ে সফল হলে ভবিষ্যতের চার্জিং ব্যবস্থায় এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।