যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবন, জীবিকা কিংবা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমানো অন্তত আটজন বাংলাদেশি গত ১৬ মাসে মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। ফ্লোরিডা, নিউইয়র্ক, পেনসিলভানিয়া ও টেনেসির মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় কেউ কর্মস্থলে, কেউ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে, আবার কেউ নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রতিবেদন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এসব প্রাণহানির ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। যদিও এসব ঘটনার পেছনে বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে কোনো সংঘবদ্ধ হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে একের পর এক এমন মৃত্যু প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।এই প্রাণহানির শুরুটা হয়েছিল ফ্লোরিডায়। ২০২৫ সালের মে মাসে মাউন্ট ডোরায় ৪৪ বছর বয়সী মনিকা ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে তাকে হত্যার অভিযোগে তার ভাশুর শাহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অন্যদিকে, চলতি বছরের এপ্রিলে ফ্লোরিডার ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই জোড়া খুনের অভিযোগে তাদের সাবেক রুমমেটকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে, গত এপ্রিলে ফ্লোরিডার ফোর্ট মায়ার্সে একটি গ্যাস স্টেশনে কর্মরত ৫১ বছর বয়সী বাংলাদেশি নারী নিলুফা ইয়াসমিন এক দুর্বৃত্তের হাতুড়ির আঘাতে নির্মমভাবে নিহত হন।
নিউইয়র্কেও একাধিক বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ম্যানহাটনের একটি ভবনে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সময় বন্দুকধারীর গুলিতে প্রাণ হারান নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) সাহসী অফিসার দিদারুল ইসলাম। মৃত্যুকালে তিনি তার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও দুই সন্তান রেখে যান।
এছাড়া, গত ২৩ আগস্ট ব্রুকলিনের ব্রাউনসভিল এলাকায় একটি রেস্তোরাঁয় কর্মরত অবস্থায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ৪৪ বছর বয়সী ইউসুফ রাজু। একই ঘটনায় রাসেল নামের আরেক বাংলাদেশি পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এর আগে জুলাই মাসে ব্রুকলিনেই ছোটখাটো এক সড়ক দুর্ঘটনার বিরোধ মেটাতে গিয়ে মুখে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন ট্যাক্সিচালক রুহুল আমিন নাসির।
পেনসিলভানিয়া ও টেনেসিতেও বাংলাদেশিদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গত ৭ জুলাই ফিলাডেলফিয়ায় ‘ডোরড্যাশ’ অ্যাপে খাবার ডেলিভারি করতে গিয়ে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের গুলিতে নিহত হন মো. মাহফুজুল হক। ৪৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তি বাংলাদেশে পেশায় একজন চিকিৎসক ছিলেন।অন্যদিকে, গত ২৩ আগস্ট টেনেসির বেলস এলাকায় নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ডাকাতি ও হত্যার শিকার হন বাংলাদেশি অভিবাসী শাহেদ রানা মোহসিন।
এই আটটি মৃত্যুর পেছনে কোনো অভিন্ন কারণ নেই। পারিবারিক বিরোধ, কর্মস্থলে ডাকাতি বা আকস্মিক বন্দুক হামলার মতো ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসব ঘটনা ঘটেছে। তাই একে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বা ধারাবাহিক হামলা বলার সুযোগ নেই।তবে রেস্তোরাঁ, গ্যাস স্টেশন, খাবার ডেলিভারি বা ট্যাক্সি চালানোর মতো পেশায় যুক্ত প্রবাসীদের প্রতিনিয়ত অপরিচিত মানুষদের সাথে কাজ করতে হয় বলে তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। এই আটটি মৃত্যু শুধু আটটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গই নয়, বরং স্বপ্নের দেশে নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশাকে ঘিরে এক বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।