চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় তার সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ আবারও পিছিয়েছে। প্রতিবেদন জমা দিতে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ নিয়ে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে নবমবারের মতো সময় নিলো তদন্ত সংস্থা।
আজ রবিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ইন্সপেক্টর জিয়াউল মোর্শেদ এদিন প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি। পরে আদালত নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।প্রায় তিন দশক ধরে আলোচিত সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনা প্রথমে অপমৃত্যু মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এর পরদিন, ২১ অক্টোবর সালমান শাহের মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। আদালত মামলার এজাহার গ্রহণ করে তদন্ত কর্মকর্তাকে তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।মামলায় আসামি করা হয়েছে সালমান শাহের সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদকে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সালমান শাহকে হত্যা করেছেন।মামলাটির তদন্ত চলার মধ্যেই চলতি বছরের গত ৯ আগস্ট ভোরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক হন আসামি আশরাফুল হক ওরফে ডন। পরে তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানো হয়।ডনের বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও দেশ ছাড়ার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চায় সিআইডি। গত ২৭ আগস্ট শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে সিআইডি জানিয়েছিল, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদে সালমান শাহের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সাথে মামলায় জড়িত অন্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেফতার এবং বিদেশে পালানোর চেষ্টার পেছনে কারও ইন্ধন ছিল কি না, সে বিষয়েও তথ্য জানার কথা জানানো হয়।রিমান্ডের দিন আদালত চত্বরে সালমান শাহের ভক্তরা জড়ো হয়ে মানববন্ধন করেন। ডনকে হাজতখানা থেকে আদালতে নেওয়া এবং শুনানি শেষে বের করার সময় তাকে লক্ষ্য করে দুয়োধ্বনি দেন তারা। একপর্যায়ে কয়েকজনকে গালাগাল করতেও দেখা যায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় পুলিশ দ্রুত ডনকে সরিয়ে নেয়।
সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনায় অতীতে একাধিক তদন্ত ও প্রতিবেদন হয়েছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার সময় সালমান শাহের পরিবার এসব প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদন করে।তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, মামলার ১২ নম্বর আসামি রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ অতীতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। ওই জবানবন্দিতে সালমান শাহকে কারা ও কীভাবে হত্যা করেছিল, সে বিষয়ে বর্ণনা ছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা দাবি করেন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহকে নিথর অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।তার মৃত্যুর পর প্রথমে রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছিল। তবে শুরু থেকেই সালমান শাহের পরিবার তার মৃত্যু স্বাভাবিক নয় এবং তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করে আসছিল। দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর পর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে নতুন করে তদন্তের আওতায় আসে।