ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধের খবর সামনে এসেছে। উভয় নেতা এক ঘণ্টাব্যাপী ফোনে কথা বলেছেন এবং উত্তপ্ত সেই ফোনালাপে নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে আবারও হামলা শুরুর পক্ষে জোর দিলেও ট্রাম্প আপাতত কূটনৈতিক আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ নিয়ে দুই নেতার মধ্যে টানাপোড়েন বেড়েছে বলে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, ইরান যুদ্ধ কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একই অবস্থানে নেই বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দুই নেতা প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী উত্তপ্ত ফোনালাপে কথা বলেছেন। ওই ফোনালাপে নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বিমান হামলা শুরুর পক্ষে জোর দেন। অন্যদিকে ট্রাম্প মনে করেন, নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার আগে কূটনীতিকে আরও একটি সুযোগ দেয়া উচিত।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ফোনালাপের পর নেতানিয়াহু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী শান্তি আলোচনায় খুবই সন্দিহান এবং তেহরানের সামরিক সক্ষমতা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আরও দুর্বল করতে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে চান। তবে ট্রাম্প মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের সুযোগ এখনও রয়েছে। যদিও তিনি এটাও জানিয়েছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে তিনি আবারও যুদ্ধ শুরুর জন্য প্রস্তুত।
ফোনালাপ সম্পর্কে অবগত সূত্রের বরাতে অ্যাক্সিওস জানায়, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলেন— মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তান এমন একটি ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ নিয়ে কাজ করছে, যা ওয়াশিংটন ও তেহরান স্বাক্ষর করতে পারে। এটি যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করার ভিত্তি তৈরি করবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৩০ দিনের আলোচনা পর্ব শুরু হতে পারে। সেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। তবে ইসরায়েলি সূত্রগুলো জানিয়েছে, নেতানিয়াহু ট্রাম্পের কৌশলের সাথে একমত নন।
আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের সূত্রগুলো বলছে, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে সরাসরি জানান যে হামলা বিলম্বিত করা ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী হামলা চালিয়ে যাওয়া উচিত। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘ফোনালাপের পর বিবির (নেতানিয়াহুর) মাথায় যেন আগুন ধরে গিয়েছিল।’
পরে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত মার্কিন আইনপ্রণেতাদেরও জানান যে নেতানিয়াহু ওই ফোনালাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। যদিও ইসরায়েলি দূতাবাস এ দাবি নিশ্চিত করেনি।
সূত্রগুলো বলছে, এর আগেও আলোচনার বিভিন্ন ধাপে নেতানিয়াহু উদ্বিগ্ন ছিলেন, বিশেষ করে আগের সমঝোতাগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায়। তবে আরেকটি সূত্রের ভাষ্য, ‘বিবি (নেতানিয়াহু) সব সময়ই উদ্বিগ্ন থাকেন।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহু আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে ট্রাম্পের সাথে সরাসরি এ বিষয়ে আলোচনা করতে চান।
অবশ্য মতবিরোধের খবর এলেও প্রকাশ্যে ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে নেতানিয়াহুর সাথে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের বার্তা দিয়েছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরান প্রশ্নে নেতানিয়াহু ‘তিনি যা চাইবেন তাই করবেন’। তবে একই সাথে তিনি বলেন, তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক রয়েছে।
ইরান ইস্যুতে এর আগেও দুই নেতার মধ্যে সাময়িক মতবিরোধ হয়েছিল। কিন্তু পরে তারা সমন্বয় করেই এগিয়েছেন।
কোস্ট গার্ড একাডেমিতে ট্রাম্প বলেন, ‘এখন প্রশ্ন একটাই— আমরা কি গিয়ে বিষয়টি শেষ করব, নাকি তারা কোনও নথিতে সই করবে। দেখা যাক কী হয়’। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখন ‘সমঝোতা ও যুদ্ধ পুনরায় শুরুর মাঝামাঝি অবস্থানে’ রয়েছে।
এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের বিরুদ্ধে ‘স্লেজহ্যামার’ নামে পুনরায় হামলার পরিকল্পনা তিনি স্থগিত করেছেন। কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় মিত্রদের অনুরোধেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরপর থেকে উপসাগরীয় মধ্যস্থতাকারীরা হোয়াইট হাউস ও পাকিস্তানি আলোচকদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে, যাতে কূটনৈতিক আলোচনার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করা যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশর যৌথভাবে একটি সংশোধিত শান্তি প্রস্তাব তৈরি করেছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দূরত্ব কমানো যায়। কমপক্ষে দুই আরব কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, কাতার সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে নতুন একটি খসড়া প্রস্তাব দিয়েছে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনা ‘ইরানের ১৪ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে’ চলছে। তারা আরও জানায়, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার মধ্যস্থতায় সহায়তার জন্য তেহরানে অবস্থান করছেন।
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আলোচনা সফল করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানি জাহাজের বিরুদ্ধে ‘জলদস্যুতা’ বন্ধ করতে হবে এবং জব্দ করা অর্থ ছাড়তে হবে। একই সাথে ইসরায়েলকে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।