শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৯ পূর্বাহ্ন

তরঙ্গের জাদুতে ২৯ বছর: বেতার সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী ‘সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ’

 সৈয়দ সাইফুল ইসলাম নাহেদ / ৪৮ মোট শেয়ার
হালনাগাদ : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬
সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশের ২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের ‘থিম লোগো’ উন্মোচন

তরঙ্গের জাদুতে ২৯ বছর: বেতার সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী ‘সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ’

ডিজিটাল স্ক্রিনের তীব্র আলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৃত্রিম ব্যস্ততা আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) এই অতি-আধুনিক যুগে মানুষের যোগাযোগের মাধ্যমগুলো প্রতি মুহূর্তে পাল্টাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে অনেক পুরোনো অভ্যাস। কিন্তু এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর বুকেও একটি প্রাচীন অথচ চিরসবুজ অদৃশ্য তরঙ্গ আজও বিশ্ববাসীকে বেঁধে রেখেছে এক সুতোয়। সেই আদি ও অকৃত্রিম জাদুর নাম ‘রেডিও’ বা ‘বেতার’। আকাশতরঙ্গে ভেসে আসা তথ্য ও বিনোদনের সেই চেনা সুরকে (বেতার সংস্কৃতিকে) বাংলাদেশে টিকিয়ে রাখতে, সাধারণ মানুষ ও নতুন প্রজন্মের কাছে এর আবেদন পৌঁছে দিতে এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শ্রোতাদের মাঝে এক অভূতপূর্ব সেতুবন্ধন তৈরি করতে বিগত ২৯ বছর ধরে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে একটি সংগঠন—সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ।
আজ ১লা অক্টোবর, ২০২৬। গৌরব ও ঐতিহ্যের দীর্ঘ পথচলা পেরিয়ে সংগঠনটি পদার্পণ করছে তার ২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে। তিন দশকের কাছাকাছি সময় ধরে বেতার সংস্কৃতির প্রচার, প্রসার ও সমাজসেবামূলক কাজে এই ক্লাবের অবদান আজ সর্বমহলে স্বীকৃত।

একটি দুর্বিষহ রাত, জীবনদায়ী তরঙ্গ ও সার্ক-এর জন্মের প্রেরণা:
সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ-এর এই বিশাল সাম্রাজ্য ও তিন দশকের পথচলার নেপথ্যে লুকিয়ে আছে এক চরম ট্র্যাজেডি এবং রেডিওর প্রতি এক আজীবন কৃতজ্ঞতার আবেগঘন ইতিহাস। ফিরে যেতে হবে ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিলের সেই ভয়াল কালরাতে। স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ ও প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ম্যারি এন তখন ঘন্টায় প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগের বাতাস নিয়ে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছিল দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের চট্টগ্রামের উপকূলভাগ, বিশেষ করে দ্বীপ অঞ্চল সন্দ্বীপকে। চারদিকে জলোচ্ছ্বাসের গর্জন, হাজার হাজার মানুষের আর্তনাদ আর নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপের এক কিশোর—দিদারুল ইকবাল (S21DAL) ও তার পরিবার।
সেই ঘোর অন্ধকারের মধ্যে একমাত্র ভরসা হয়ে জেগেছিল একটি ব্যাটারিচালিত প্যানাসনিক আরএফ-৫৬২ মডেলের ৩ ব্যান্ডের অ্যানালগ রেডিও। বাংলাদেশ বেতার-চট্টগ্রাম থেকে ক্রমাগত প্রচারিত ঘূর্ণিঝড়ের বিশেষ আবহাওয়া বুলেটিন ও সতর্কবার্তা শুনেই শেষ মুহূর্তে নিজের জেঠার ঘরের চিলেকোঠায় (বাবার বড় মামাতো ভাই মো. জহিরুল ইসলাম এর ঘরে) নিরাপদ আশ্রয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল দিদারুল ইকবালের পরিবার। বেতারের সেই জীবনদায়ী বার্তার কারণে দিদারুল ইকবাল ও তার অতি নিকটজনেরা সেদিন অলৌকিকভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান। কিন্তু সেই রাতের তাণ্ডব ছিল বড় নিষ্ঠুর। দিদারুল ইকবালের নিজ বাড়ির অনেক আত্মীয়স্বজন এবং সন্দ্বীপের হাজার হাজার চেনা মানুষ সেই জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারান। রাস্তাঘাট, ফসলি জমি এবং চারপাশ জুড়ে মানুষ ও গবাদি পশুপাখির লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। বেঁচে থাকা মানুষের জন্য সেটি ছিল এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, যেখানে চেনা স্বজনদের লাশ চেনার বা দাফন করার মতো স্বাভাবিক অবস্থাটুকুও ছিল না। এই দুর্যোগের ফলে সন্দ্বীপের অধিকাংশ বাড়িঘর, বেড়িবাঁধ ও গবাদিপশু ধ্বংস হয়ে যায় এবং লক্ষাধিক মানুষ রাতারাতি গৃহহীন ও সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন।
স্বজন হারানোর সেই বুকফাটা আর্তনাদ আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে কিশোর দিদারুল ইকবালের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল রেডিওর ভূমিকা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, রেডিও কেবল গান-বাজনা শোনার বাক্স নয়; এটি চরম দুর্যোগে মানুষের জীবন বাঁচানোর এক পরম বন্ধু। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্মৃতি, স্বজনদের হারানোর বেদনা আর বেতারের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই দিদারুল ইকবালের মনে এক নতুন স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়। আর সেই আবেগ ও মানবিক তাগিদই পরবর্তীতে তাঁকে একটি দেশব্যাপী বেতার শ্রোতাক্লাব গঠনে আজীবন উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় এই অববাহিকায় রেকর্ডকৃত অন্যতম শক্তিশালী এই ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়টি ২০ ফুটেরও বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করেছিল, যা উপকূলরেখাকে প্লাবিত করে। এর ফলে কমপক্ষে ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৮৬৬ জন মানুষের মৃত্যু হয়। এদের বেশিরভাগই নিহত হয় চট্টগ্রাম জেলার উপকূল ও উপকূলীয় দ্বীপসমূহে। সন্দ্বীপ, মহেশখালী, হাতিয়া ইত্যাদী দ্বীপে নিহতের সংখ্যা সর্বাধিক। যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। মৃত্যু ছাড়াও প্রায় ১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১৯৯১ সালের হিসাবে) সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই বিপর্যয়কর ক্ষয়ক্ষতির ফলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশ অপারেশন সি অ্যাঞ্জেল পরিচালনা করে, যা ছিল সর্বকালের অন্যতম বৃহৎ সামরিক ত্রাণ প্রচেষ্টা। ১৯৭০ সালে ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের পর অনেক সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হলেও সচেতনতা ও অজ্ঞাতার কারণে অনেকেই সাইক্লোনের মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে সেখানে আশ্রয় নেয়। দিদারুল ইকবাল (S21DAL) এর পরিবারের মতো অনেকেই সেদিন ঝড়ের ভয়াবহতা বেশি হবে না এই আশায় আশ্রয় কেন্দ্রে উপস্থিত হয় নি। ধারণা করা হয় প্রায় ২০ লক্ষ লোক আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে বিপদজনক স্থানে অবস্থানের কারণে ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হয়।

বাংলাদেশে শ্রোতা ক্লাবের বিবর্তন ও ইতিহাস:
বাংলাদেশে ‘বেতার শ্রোতা ক্লাব’ (Radio Listeners Club)-এর ধারণাটি কেবল একটি শখের জায়গা থেকে আসেনি, এর পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ সামাজিক ও গণযোগাযোগের ইতিহাস। মূলত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ সাধারণ মানুষের মনে রেডিওর প্রতি যে গভীর আবেগ ও দেশপ্রেমের জন্ম দিয়েছিল, স্বাধীনতার পর তা এক নতুন সামাজিক রূপ লাভ করে।

স্বাধীনতার পরবর্তী দশক ও প্রথম শ্রোতা ক্লাব:
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে শ্রোতারা নিজ উদ্যোগে রেডিও শোনার জন্য দলবদ্ধ হতে শুরু করেন। বিনোদন এবং বিশেষ করে রাজনীতি, কৃষি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল বাংলাদেশ বেতার (তৎকালীন রেডিও বাংলাদেশ)। অনেক এলাকায় একক কোনো ব্যক্তির রেডিওকে কেন্দ্র করে পুরো পাড়ার মানুষ জড়ো হতো। এই ধারা থেকেই বাংলাদেশে প্রথম অনানুষ্ঠানিক ‘বেতার শ্রোতা ক্লাব’গুলোর জন্ম হয়।

আন্তর্জাতিক বেতারের ভূমিকা ও ডিএক্সিং (DXing):
আশির ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে শ্রোতা ক্লাবের ধারণাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে মূলত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শর্টওয়েভ (SW) বেতারের জনপ্রিয়তার কারণে। বিবিসি বাংলা (BBC), ভয়েস অব আমেরিকা (VOA), চীন আন্তর্জাতিক বেতার (CRI), ডয়চে ভেলে (DW), রেডিও ভেরিতাস এশিয়া (RVA), রেডিও তেহরান (IRIB), রেডিও রিপাবলিক ইন্দোনেশিয়া (RRI), রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল (RFI), রেডিও নেদারল্যান্ড ওয়ার্ল্ডওয়াইড (RNW), রেডিও রাশিয়া (RUVR), রেডিও প্রাগ ইন্টারন্যাশনাল (RPI), রেডিও রোমানিয়া ইন্টারন্যাশনাল (RRI), রেডিও স্লোভাকিয়া ইন্টারন্যাশনাল (RSI), রেডিও তাইওয়ান ইন্টারন্যাশনাল (RTI), ভয়েস অব তুর্কি রেডিও (TRT), ভয়েস অব ভিয়েতনাম (VOV), রেডিও সৌদিআরব (RSI), কেবিএস ওয়ার্ল্ড রেডিও (KBS), রেডিও কায়রো (RC), এবিসি রেডিও অস্ট্রেলিয়া (ABC), রেডিও কানাডা ইন্টারন্যাশনাল (RCI), রেডিও পাকিস্তান (PBC) এবং অল ইন্ডিয়া রেডিও আকাশবাণী (AIR)’র মতো কেন্দ্রগুলো শ্রোতাদের চিঠিপত্র এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে। আন্তর্জাতিক এই বেতার কেন্দ্রগুলো শ্রোতাদের নিজেদের মধ্যে ক্লাব গঠনে দারুণভাবে উৎসাহিত করে। একই সাথে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বেতার তরঙ্গ খুঁজে বের করার রোমাঞ্চকর শখ বা ‘রেডিও ডিএক্সিং’ (Radio DXing) তরুণ প্রজন্মের মাঝে শ্রোতা ক্লাব গড়ার জোয়ার এনে দেয়।

সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর:
আজ থেকে ঠিক ২৯ বছর আগে, চট্টগ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিচ্ছিন্ন শ্রোতাদের সুসংগঠিত করে একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন একজন স্বপ্নবাজ বেতারপ্রেমী মানুষ। ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে, ১৯৯৭ সালের ১লা অক্টোবর সন্দ্বীপের সেই তরুণ রেডিও অ্যাক্টিভিস্ট দিদারুল ইকবাল (S21DAL)-এর হাত ধরে প্রথমে চট্টগ্রাম শহরে বাংলাদেশ রেলওয়ের সিগন্যাল ইন্সপেক্টর অফিস, সিগন্যাল কেবিন এলাকায় যাত্রা শুরু করে ‘চট্টগ্রাম ওয়ার্ল্ড রেডিও ডিএক্স লিসেনার্স ক্লাব’, যা পরবর্তীতে ১৯৯১-এর সেই ট্র্যাজেডির চেতনাকে বুকে ধারণ করে দেশজুড়ে আরও বিস্তৃত হয়ে ‘সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। এটি বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকা শ্রোতা আন্দোলনের ধারণাকে একটি শক্তিশালী, সমাজকল্যাণমূখী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। এই অলাভজনক, স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক, বন্ধুত্ব, তথ্য ও যোগাযোগভিত্তিক আন্তর্জাতিক বেতার শ্রোতা সংগঠনটি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন শর্টওয়েভ (Shortwave) ও মিডিয়ামওয়েভ (Mediumwave) রেডিও স্টেশন শোনা, দূরবর্তী সিগন্যাল ট্র্যাক করা এবং স্টেশনগুলোর কাছে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠিয়ে ‘QSL কার্ড’ বা স্বীকৃতি সংগ্রহ করা ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বেতার কর্তৃপক্ষকে মতামত দেওয়ার পাশাপাশি বেতার সংস্কৃতির প্রচার, প্রসার এবং আধুনিকায়ন করা; রাষ্ট্রীয় বাংলাদেশ বেতার এবং বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও অনলাইন বেতারের অনুষ্ঠান সম্পর্কে শ্রোতাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা; বেতার মাধ্যম এবং শ্রোতাদের মাঝে সুদৃঢ় সেতুবন্ধন তৈরি করা; নিয়মিতভাবে বিশ্ব বেতার দিবস, ক্লাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক বেতারের বিভিন্ন ল্যান্ডমার্ক ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা; রেডিও ডিএক্সিং (Radio DXing); ডিএক্সিং প্রদর্শনী; রেডিও মেলা; বাংলাদেশের শহর, গ্রাম, উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলসহ সর্বত্র অঞ্চলভিত্তিক শ্রোতা তৈরি এবং বিভিন্ন জরিপ ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বেতার শ্রোতার সংখ্যা বৃদ্ধি করা; দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন বেতার কেন্দ্র এবং শ্রোতাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা; বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়ন করা; শ্রোতা সম্মেলন আয়োজন; বাল্যবিয়ে রোধ; নারী ও শিশু নির্যাতন রোধ; মাদক বিরোধী আন্দোলন; বৃক্ষরোপণ; দুর্যোগের আগাম বার্তা পৌঁছানো; সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন সহ সমাজকল্যাণমূলক নানা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখাই এই ক্লাবের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করা এই সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, শহর, স্কুল-কলেজ এবং তৃণমূল পর্যায়ে এছাড়া বিদেশে (দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত) ৫০টিরও বেশি “ইউনিট” বা শাখা গঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট রেডিও অ্যাক্টিভিস্ট দিদারুল ইকবাল (S21DAL)-এর দূরদর্শী নেতৃত্বে ক্লাবটি আজ আন্তর্জাতিক মহলে এক সুপরিচিত নাম। ১৯৯৭ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ পথচলায় সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ শুধু শ্রোতাদের একটি সাধারণ ক্লাব হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক বেতার যোগাযোগ, তথ্য বিনিময় এবং সমাজকল্যাণের অন্যতম শক্তিশালী একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে। বর্তমানে দেশ-বিদেশের হাজারো বেতার শ্রোতা ও ডিএক্সার (DXer) এই সংগঠনের ছায়াতলে যুক্ত রয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে/ বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের গৌরবগাথা:
সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ কেবল দেশের ভেতরেই কাজ করেনি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাম অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ক্লাবের ধারাবাহিক ও নিষ্কলঙ্ক কার্যক্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ মিলেছে বিশ্বমানের বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননা:

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ইন্দোনেশিয়া ও চীন সফর:
ডিএক্সিং কার্যক্রম ও ক্লাবটির গৌরবময় কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে ইন্দোনেশিয়া সরকারের পর্যটন ও সৃজনশীল অর্থনীতি মন্ত্রণালয় এবং রেডিও রিপাবলিক ইন্দোনেশিয়া (RRI) ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ভয়েস অব ইন্দোনেশিয়া কর্তৃক আয়োজিত বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক কুইজ প্রতিযোগিতা “ওয়ান্ডারফুল ইন্দোনেশিয়া কুইজ ২০১২” এবং চীন আন্তর্জাতিক বেতার (CRI) কর্তৃক আয়োজিত “মনোহর নারিকেল দ্বীপ: চীনের হাইনান আন্তর্জাতিক পর্যটন দ্বীপ” বিষয়ক জ্ঞান যাচাই প্রতিযোগিতা ২০১২ ও সিআরআই শ্রেষ্ঠ ফ্যান ক্লাব প্রতিযোগিতা ২০১৩-এ অংশগ্রহণ করে মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ। প্রতিযোগিতায় শীর্ষ বিজয়ী হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ ক্লাবের চেয়ারম্যান দিদারুল ইকবাল (S21DAL) ও ভাইস চেয়ারম্যান তাছলিমা আক্তার লিমা ইন্দোনেশিয়া ও চীন সরকারের বিশেষ আমন্ত্রণে ও সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ইন্দোনেশিয়া ও চীন ভ্রমণের এক বিরল গৌরব অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতায় এই দুই দেশের ভ্রমণ বাংলাদেশের ডিএক্সিং জগতের জন্য এক বিরল সম্মান বয়ে এনেছে। বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে বিশ্বমৈত্রী ও বাংলাদেশের নাম আন্তর্জাতিক দরবারে তুলে ধরার জন্য দিদারুল ইকবাল (S21DAL) এবং তাছলিমা আক্তার লিমার এই ঐতিহাসিক মাইলফলক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ফিলিপাইনে বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব:
ফিলিপাইনের ম্যানিলা থেকে সম্প্রচারিত বিখ্যাত আন্তর্জাতিক বেতার কেন্দ্র ‘রেডিও ভেরিতাস এশিয়া’ (RVA) থেকে সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ অর্জন করেছে মর্যাদাপূর্ণ ‘বেস্ট অ্যাক্টিভ ক্লাব রিকগনিশন’। ২০১৯ সালে ফিলিপাইনের ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত রেডিও ভেরিতাস এশিয়া (RVA)-এর ৫০ বছর পূর্তি (সুবর্ণ জয়ন্তী) উৎসবের আন্তর্জাতিক মঞ্চে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের একমাত্র শ্রোতা সংগঠক হিসেবে বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হয়ে ফিলিপাইন সফরের সুযোগ পান সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান দিদারুল ইকবাল (S21DAL)। একজন বাংলাদেশি শ্রোতা সংগঠকের এমন বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাওয়া দেশের বেতার ইতিহাসের একটি বিরল এবং গৌরবময় অধ্যায়।

ভারতের আউটরিচ পুরস্কার ও অন্যান্য:
রেডিওকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান এবং শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ বিশ্ব বেতার দিবস উদযাপন উপলক্ষে ওড়িশা রাজ্যে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বেতার শ্রোতা সংগঠন সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ-কে আউটরিচ রেডিও অ্যাওয়ার্ড-২০১৮ আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিখ্যাত প্রচার মাধ্যম ও সংস্থা ‘আউটরিচ’ (Outreach)। বেতার শ্রোতাদের সংগঠিত করা এবং সামাজিক উন্নয়নে রেডিওর ব্যবহারকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও রেডিও অ্যাক্টিভিস্ট দিদারুল ইকবালের নেতৃত্বে সংগঠনটি এই গৌরবময় অর্জন লুফে নেয়। এছাড়া ভারতের কলকাতায় ‘পশ্চিমবঙ্গ ইউনিট’ গঠনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করে দুই বাংলার বেতার শ্রোতাদের এক মঞ্চে এনেছে সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক)।
জার্মানি, রোমানিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, চীন, জাপান, আমেরিকা, তাইওয়ান, কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভিয়েতনাম, মঙ্গোলিয়া, ইরান, নেদারল্যান্ড, ভারত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেতারের কিউএসএল (QSL) কার্ড, ভিউ-কার্ড, স্টিকার, ডাকটিকেট, সার্টিফিকেট এবং ঐতিহাসিক অসংখ্য স্মারক/ পুরস্কার সংগ্রহ করে সংগঠনটি নিজেদের পরিণত করেছে এক জীবন্ত রেডিও সংগ্রহশালায়।

দেশীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি: আন্তর্জাতিক অঙ্গন ছাড়িয়ে দেশের মাটিতেও সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ তার কাজের ছাপ রেখেছে। দেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতার-সহ দেশের বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও নামী-দামী জাতীয় পত্রিকা/ সংবাদমাধ্যম থেকে একাধিক সম্মাননা ও অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছে এই সংগঠন। যেমন- শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক স্মৃতি পরিষদ থেকে শেরে বাংলা গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড-২০২৫; দৈনিক অভিযোগ বার্তা ও স্টার বাংলাদেশ মিডিয়া কর্তৃক স্টার অ্যাচিভার্স অ্যাওয়ার্ড-২০২৫; দৈনিক মানবাধিকার প্রতিদিন ও স্টার বাংলাদেশ মিডিয়া কর্তৃক বেস্ট প্রফেশনাল অ্যাওয়ার্ড-২০২৫; গ্লোবাল ইয়ুথ বিজনেস ইনোভেশন ফোরাম কর্তৃক গ্লোবাল আইকনিক লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড-২০২৬; সমীকরণ আদর্শ সাংস্কৃতিক সংগঠন কর্তৃক সমীকরণ অগ্রযাত্রা সম্মাননা-২০২৬ এবং স্টার বাংলাদেশ মিডিয়া ও বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক সোসাইটি (বিএমএসএস) কর্তৃক স্টার বাংলাদেশ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ (সিজন-০২)।

সমাজসেবা ও মানবিক কার্যক্রমে সার্ক:
কেবল রেডিও শোনা বা ডিএক্সিংয়ের (DXing) মাঝেই নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেও সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ সবসময় অগ্রগামী। বিভিন্ন সময়ে আর্তমানবতার সেবা, রক্তদান কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ অভিযান, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরিতে এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে নানামুখী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে এই সংগঠনের কর্মীরা। রেডিও যে কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার—তা প্রমাণ করেছে সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ।

দেশ-বিদেশের গুণীজন ও গণমাধ্যমে সার্ক বাংলাদেশ:
সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ-এর ধারাবাহিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বেতার উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের পরিধি কেবল সাধারণ শ্রোতাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন সময়ে ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনার, বিশ্ব বেতার দিবস উদযাপন এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানগুলোতে চীন, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, জার্মান, ভারত ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বেতার ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী, এমপি, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যম গবেষকরা সশরীরে অংশ নিয়ে এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
একই সাথে, বিগত ২৯ বছর ধরে সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ-এর সমাজকল্যাণমূলক কাজ এবং বেতার সংস্কৃতির প্রসারে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের তথ্য দেশ ও বিদেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়ে আসছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রচুর মিডিয়া কাভারেজ পেয়েছে সংগঠনটি। বিশেষ করে ক্লাবের আন্তর্জাতিক অর্জন, রেডিও ডিএক্সিং নিয়ে তরুণদের সচেতনতাবৃদ্ধি এবং আর্তমানবতার সেবায় নেওয়া উদ্যোগগুলো নিয়ে বহু সচিত্র প্রতিবেদন ও ফিচার প্রকাশিত হয়েছে। যা এই ক্লাবের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনপ্রিয়তার এক অনন্য দলিল।

২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও বিশেষ ‘থিম লোগো’র বার্তা:
প্রতি বছরের মতো এবারও ২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ-এর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ‘থিম লোগো’ উন্মোচন করা হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ বেতার-সিলেটের সভাকক্ষে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই লোগো প্রকাশ করা হয়।
বিশেষ লোগোটি তৈরি করেছেন ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও রেডিও অ্যাক্টিভিস্ট দিদারুল ইকবাল (S21DAL)। লোগোটিতে সংগঠনের আদর্শ, রেডিওর ঐতিহ্য এবং সম্প্রীতির এক চমৎকার মেলবন্ধন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিশেষ লোগোটির ডিজাইনগত কাঠামো এবং এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি লোগো বা প্রতীক শুধুমাত্র কিছু রঙের সমষ্টি নয়, বরং এটি সংগঠনের দীর্ঘদিনের দর্শনকে ধারণ করে।
নিচে লোগোটির তিনটি সুনির্দিষ্ট এবং দূরদর্শী উদ্দেশ্য, প্রতিটি অংশের বিশদ ব্যাখ্যা ও ডিজাইনের দর্শন তুলে ধরা হয়েছে।
(০১) ঐতিহ্যের গৌরবগাথা উদযাপন: ১৯৯৭ সালের ১লা অক্টোবর থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ১লা অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ ২৯ বছরের সফল ও গৌরবময় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমকে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে স্মরণ করিয়ে দেওয়া।

(০২) বেতার সংস্কৃতির আধুনিকায়ন: ইন্টারনেট আর পডকাস্টের এই যুগেও অন্যতম শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে রেডিওর প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব টিকিয়ে রাখা এবং সাধারণ মানুষের কাছে এর আধুনিক রূপকে তুলে ধরা।

(০৩) আঞ্চলিক ও সামাজিক নেটওয়ার্কিং: বেতার শ্রোতা, ক্লাবের সদস্য এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে সুদৃঢ় যোগাযোগ, ভ্রাতৃত্ববোধ ও প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলা।

লোগোর নকশা দর্শনের গভীর ব্যাখ্যা (Explanation of Design Philosophy):
লোগোর নকশা বা ডিজাইনটি খুব নিখুঁতভাবে বেশ কিছু প্রতীকী উপাদানের সাহায্যে সাজানো হয়েছে, যা বার্তাটিকে সহজে মনে রাখার মতো করে তোলে।
১. মূল আকৃতি ও রঙের ব্যবহার:
লাল ও সবুজ রঙ (জাতীয় চেতনার প্রতিফলন): বৃত্তাকার লাল অংশ এবং ভেতরে সংখ্যা প্রতীক ২ এবং ৯ এর যৌথ সমন্বয়ে অর্থাৎ ২৯ দিয়ে তৈরী বিশেষ সবুজ নকশাটি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার রঙের প্রতীক। এটি প্রকাশ করে যে, ক্লাবটি ২৯ বছর ধরে ইথার বা বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগ রক্ষা, তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, সংস্কৃতির আদান-প্রদান, বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের সেতু গড়ে তোলা, রেডিও এবং শ্রোতা ও শ্রোতা ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করা নিয়ে কাজ করলেও এর মূল চেতনা ও দেশপ্রেম বাংলাদেশে প্রোথিত।
সাদা রঙের বৃত্ত: লোগোর ভেতরের সাদা অংশটি শান্তি, পরিচ্ছন্নতা এবং নিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে কাজ করছে।

২. কেন্দ্রীয় প্রতীকসমূহ:
হ্যান্ডশেক বা করমর্দন: লোগোর ঠিক মাঝখানে/ কেন্দ্রে থাকা (২৯ এর মাঝে) দুটি হাত মেলানোর দৃশ্যটি বন্ধুত্ব, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক ঐক্যের প্রতীক। এটি সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে, শ্রোতাদের সাথে, দেশ-বিদেশ এবং বেতারের সাথে সুদৃঢ় বন্ধন নিখুঁতভাবে প্রকাশ করে।
রেডিও ও মাইক্রোফোন/ তরঙ্গ ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন (সার্ক লোগো): করমর্দনের ঠিক ওপরে একটি ছোট লাল বৃত্তের ভেতর সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশের মূল লোগো যুক্ত করা হয়েছে। যেখানে- রেডিও তরঙ্গের সংকেত, টাওয়ার এবং একটি মাইক্রোফোন দেখা যাচ্ছে। এটি মূলত সংগঠনের মূল ভিত্তি অর্থাৎ ‘রেডিও’ এবং এর সম্প্রচার কার্যক্রমের প্রতিনিধিত্ব করে, যা আধুনিক যুগের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। পাশে ‘SARC’ লেখাটি সংগঠনের সংক্ষিপ্ত নামকে নির্দেশ করে।

৩. প্রতিপাদ্য/ থিম:
ইতিবাচক অংশীদারিত্ব বা Positive Partnership-এর মূল বার্তা: লোগোর লাল বৃত্তের ওপরের অংশে বাংলা ও ইংরেজিতে সংগঠনের এবারের মূল প্রতিপাদ্য “POSITIVE PARTNERSHIP বা ইতিবাচক অংশীদারিত্ব” লেখা রয়েছে। এটি পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—কোনো একক প্রচেষ্টা নয়, বরং সবাই মিলে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বেতার সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণে ভূমিকা রাখা।
সংগঠনের নাম: নিচের অংশে বড় অক্ষরে “SOUTH ASIA RADIO CLUB (SARC) BANGLADESH” লেখা রয়েছে, যা সংগঠনের পূর্ণ নামকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

৪. গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল:
১লা অক্টোবর ১৯৯৭ – ১লা অক্টোবর ২০২৬: লোগোর সাদা অংশে সংগঠনের যাত্রার শুরুর তারিখ (১লা অক্টোবর ১৯৯৭) এবং ২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তারিখ (১লা অক্টোবর ২০২৬) উল্লেখ করা হয়েছে। এটি দেশি এবং বিদেশী বেতার ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে সংগঠনের দীর্ঘ ২৯ বছরের সফল পথচলা এবং ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

৫. সহজপাঠ্যতা ও বৃত্তাকার ভারসাম্য:
লোগোটিকে একটি নিখুঁত বৃত্তের ফ্রেমে আবদ্ধ করা হয়েছে। বৃত্তাকার নকশা চিরন্তনতা ও অবিচ্ছিন্নতার প্রতীক। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় স্পষ্ট ফন্ট ব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো যাতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় স্তরের বেতার কর্তৃপক্ষ, অন্যান্য গণমাধ্যম, শ্রোতা ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা এর উদ্দেশ্য সহজে বুঝতে পারেন।
এই বিশেষ লোগোটি “সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ”-এর শুধুমাত্র একটি জন্মদিনের স্মারক নয়, বরং এটি আগামী দিনগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা বা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বেতারের সোনালী দিনগুলোকে টিকিয়ে রাখার এবং ক্লাবের সমাজসেবামূলক লক্ষ্যকে এগিয়ে নেওয়ার একটি দৃশ্যমান অঙ্গীকার।

ডিজিটাল যুগে রেডিওর প্রাসঙ্গিকতা ও ভবিষ্যৎ:
অনেকে মনে করেন ডিজিটাল দুনিয়ায় পডকাস্ট কিংবা ইন্টারনেটের যুগে শর্টওয়েভ (SW) বা এফএম (FM) রেডিওর আবেদন ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু সার্ক বাংলাদেশ মনে করে, রেডিওর রূপান্তর ঘটেছে মাত্র, এর গুরুত্ব কমেনি। আজকের দিনেও যেকোনো বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা যুদ্ধের সময় যখন ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ধসে পড়ে, তখন পৃথিবীর একমাত্র ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে টিকে থাকে রেডিও। যেকোন দুর্যোগ ছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলে তথ্য পৌঁছানোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যমও এই প্রাচীন রেডিও। আর তাই, নতুন প্রজন্মের কাছে রেডিওর কারিগরি শিক্ষা (যেমন: রেডিও ডিএক্সিং, স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ও হ্যাম রেডিওর ধারণা) এবং বিনোদনের সুস্থ ধারাকে পৌঁছে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সার্ক বাংলাদেশ। ক্লাবটি তরুণদের শেখাচ্ছে কীভাবে একটি সাধারণ রেডিও সেট ও অ্যান্টেনাকে কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার মাইল দূরের দেশের সংস্কৃতি ও খবর ঘরে বসেই জানা সম্ভব।

সুরের চলুক অবিরাম পথচলা
১৯৯১ সালের সেই দুর্বিষহ ঝড় আর স্বজন হারানোর বেদনা থেকে যে যাত্রার মানসিক সূচনা হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ১লা অক্টোবর, তা আজ ২৯ বছরের এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। শ্রোতাদের মনের অব্যক্ত কথা আর বেতারের সুরকে এক সুতোয় বেধে রেখেছে সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাব (সার্ক) বাংলাদেশ। আকাশবাণীর তরঙ্গে ভেসে আসা সেই চেনা নস্টালজিক সুরের মতোই সার্ক বাংলাদেশের এই পথচলা হোক চিরন্তন।
২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে সার্ক বাংলাদেশের সকল সদস্য, শুভানুধ্যায়ী এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি বেতার শ্রোতাকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও লাল গোলাপ শুভেচ্ছা। বেতারের জয় হোক, তরঙ্গের মায়ায় বেঁচে থাকুক মানুষের চিরন্তন ভালোবাসা!


এই বিভাগের আরো খবর