শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩১ পূর্বাহ্ন

প্যারাগুয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট হলেন পেড্রো আলিয়ানা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / ২৬ মোট শেয়ার
হালনাগাদ : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬
প্যারাগুয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট হলেন পেড্রো আলিয়ানা

মাত্র তিন দিনের রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই ভাগ্য বদলে গেল প্যারাগুয়ের উপরাষ্ট্রপতি পেদ্রো আলিয়ানার। সাবেক প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়ার অভিশংসনের কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন তিনি। এর আগে প্রায় তিন বছর উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন ৫২ বছর বয়সী এই রাজনীতিক।সাবেক জাতীয় বাস্কেটবল খেলোয়াড়, ব্যবসায়ী এবং ক্ষমতাসীন কলোরাডো পার্টির প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত আলিয়ানা এখন গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে দেশটির উয়েনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে পড়ায় লাখ লাখ গ্রাহকের সঞ্চয় আটকে যায়। এতে ব্যাপক উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাংকটির আর্থিক সংকট এবং সংশ্লিষ্ট অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়ার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার আইনপ্রণেতাদের ভোটে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আলিয়ানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ২০২৮ সালের আগস্টে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ব্যাংকিং সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবেন।

১৯৭৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্যারাগুয়ের নদীতীরবর্তী শহর পিলারে জন্মগ্রহণ করেন পেদ্রো আলিয়ানা। রাজনীতিতে আসার আগে ব্যবসার পাশাপাশি বাস্কেটবল খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন তিনি। ১৯৯১ সালে জায়গা করে নেন প্যারাগুয়ের জাতীয় বাস্কেটবল দলে।তবে তাঁর জীবন শুধু সাফল্যের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৩ সালে তাঁর ২৪ বছর বয়সী ভাই রডলফো ‘পিলি’ আলিয়ানা অপহৃত ও খুন হন। আদালতের রায়ে উঠে আসে, সিগারেট চোরাচালানের একটি বিশাল ব্যবসার অর্থায়নের উদ্দেশ্যে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল।

ব্যক্তিগত জীবনেও কঠিন সময় পার করেছেন আলিয়ানা। ২০১৮ সালে তাঁর লিউকেমিয়া ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য তাঁকে ব্রাজিলে যেতে হয়। ২০১৯ সালে রোগমুক্তির ঘোষণা দিলেও ২০২১ সালে আবারও কেমোথেরাপি নিতে হয় তাঁকে।

রাজনীতির সঙ্গে আলিয়ানার পরিচয় শৈশব থেকেই। তাঁর বাবা-মা দুজনেই স্থানীয় কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৬ সালে নিজ শহরের মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হলেও ২০০৮ সালে নিমবুকু বিভাগের গভর্নর নির্বাচিত হন তিনি।

পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন আলিয়ানা। ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটির নিম্নকক্ষ চেম্বার অব ডেপুটিজের সদস্য ছিলেন। এ সময় তিনি নিম্নকক্ষের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। পরে ক্ষমতাসীন কলোরাডো পার্টির নেতৃত্বে আসেন।সাবেক প্রেসিডেন্ট হোরাসিও কার্তেসের রাজনৈতিক সমর্থন তাঁর উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কার্তেসের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বলয়ের মধ্য দিয়েই জাতীয় পর্যায়ে তাঁর প্রভাব বাড়তে থাকে।

২০২১ সালে সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কার্তেসের পরামর্শে সান্তিয়াগো পেনিয়ার রানিং মেট হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পেনিয়াও একসময় আলিয়ানার প্রশংসা করে তাঁকে প্যারাগুয়ের ইতিহাসের সেরা উপরাষ্ট্রপতিদের একজন হওয়ার সম্ভাবনাময় ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

কংগ্রেস সদস্য ফাবিয়ানা সাউতোর স্বামী এবং চার সন্তানের জনক আলিয়ানা। সরকারি প্রশাসনে তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্যের নিয়োগ নিয়ে অতীতে সমালোচনার মুখেও পড়েছেন তিনি। তাঁদের মধ্যে তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা মনসেরাত আলিয়ানাও রয়েছেন।একসময় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে ক্ষমতাসীন দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অন্যতম সম্ভাব্য ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হলেও তাঁর রাজনৈতিক পথ মসৃণ ছিল না।

উপরাষ্ট্রপতি হওয়ার এক বছর পরই একদিন দেশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন আলিয়ানা। ২০২৫ সালে হোরাসিও কার্তেসও একটি দলীয় অনুষ্ঠানে তাঁকে ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান।

তবে পরবর্তী সময়ে কার্তেসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় কার্তেসের সমর্থন প্রত্যাহারের পর আলিয়ানা নিজের রাজনৈতিক স্বাধীনতার ইঙ্গিত দেন। গত ২৬ অক্টোবর তিনি বলেন, আনুগত্যকে কখনোই ‘অন্ধ আনুগত্যের’ সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তনের মধ্যেই পেনিয়ার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে আইনপ্রণেতারা আলিয়ানার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কার্যক্রম স্থগিত রাখেন। ফলে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর অবস্থান অক্ষুণ্ণ থাকে এবং পেনিয়ার অপসারণের পর সাংবিধানিক নিয়মে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান তিনি।

মাত্র তিন দিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ পদে পৌঁছে দিয়েছে। এখন তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।২০২৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাওয়া আলিয়ানা এই সংকট কতটা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারেন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে প্যারাগুয়ের জনগণ


এই বিভাগের আরো খবর