ওসমানী হাসপাতালের চিত্র বদলায়নি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পরও
ওয়ার্ড বয়ের বিরুদ্ধে অর্থ আদায় দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও সেবায় বিলম্বের অভিযোগ
দুর্গন্ধের কারণে তারা নাকমুখ চেপে থাকছেন
ক্যান্টিনের চারপাশের মেঝেতেও ময়লা
সিঁড়ির কোনেও জমে আছে ময়লা-আবর্জনা ও পানের পিক
চলতি মাসের শুরুতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে সাত দিনের মধ্যে হাসপাতালের সব সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সফরের একমাস পেরোতে চললেও এখন পর্যন্ত কোন কিছুরই পরিবর্তন হয়নি।সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে হাসপাতালের সেবাব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, রোগী হয়রানি, অর্থ আদায় এবং দালালচক্রের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে কিছু ওয়ার্ড বয় ও কর্মচারী রোগীকে সহযোগিতা, ট্রলি কিংবা অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে অনৈতিকভাবে টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে রোগীকে হয়রানি বা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না করার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীকে ওয়ার্ড থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। তবে এসব অভিযোগের সবকটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে কর্মরত এক ওয়ার্ড বয়ের বিরুদ্ধে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে অনিয়ম ও অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগে হাসপাতালের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।হাসপাতালের ভেতরে ও আশপাশে দালালচক্রের তৎপরতা নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। রোগী হাসপাতালে প্রবেশের পরপরই কিছু ব্যক্তি নিজেদের হাসপাতালের কর্মী বা চিকিৎসকের পরিচিত হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা, ওষুধ কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার নামে রোগীর স্বজনদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।দালালদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও শাস্তির ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এরপরও একই ধরনের অভিযোগ থাকায় প্রশ্ন উঠেছে—দালালচক্রের মূল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে কি না।রোগী ও স্বজনদের একাংশের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সদের বারবার জানানোর পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীকে সময়মতো দেখা হয় না।
জরুরি অবস্থায় দ্রুত সাড়া না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।চিকিৎসকদের কর্মঘণ্টা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক নজরদারির পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকেও হাসপাতালের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের খবর প্রকাশিত হয়েছে।চারপাশ ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকার পাশাপাশি বাথরুমের ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, যা চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।নতুন ভবনের লিফটে ওঠার জন্য রোগী-স্বজনদের জটলার মধ্যে রোগীদের জন্য খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় খাবার বিতরণের দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তিকে।
চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি রোগীদের সরবরাহ করা খাবারের মান ও পরিবেশন পদ্ধতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।নতুন ভবনের পুরুষ মেডিসিন বিভাগের এক রোগী বলেন, “দুপুরের খাবারে ভাত, এক টুকরো মুরগি আর এক হাতা সবজি দেওয়া হয়। তবে পরিচ্ছন্নতা না মেনে তারা মুরগি ও সবজি একসঙ্গেই ঢেলে দেয়; আলাদা করে দিতে চাইলে দিতে চায় না।”হাসপাতালেল পরিবেশ কিংবা সেবার মানের তেমন কোনো উন্নতিই হয়নি। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসাসেবা ও পরিচ্ছন্নতায় ‘দৃশ্যমান পরিবর্তনের’ কথা দাবি করছে।জরুরি বিভাগ দিয়ে ঢোকার পর নিচতলার বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক-পলিথিন ও পানের পিক পড়ে থাকতে দেখা যায়। সিঁড়ির বিভিন্ন কোনেও জমে আছে ময়লা-আবর্জনা ও পানের পিক।হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার হৃদরোগ ওর্য়াডে রোগীদের ভিড় দেখা গেছে। এ ওয়ার্ডের বারান্দা ও মেঝেতেও বেড পেতে রোগীদের রাখা হয়েছে। বাথরুমে দুর্গন্ধ। মেঝেতে জমে থাকা পানির সঙ্গে জুতার ধুলোবালি মিশে পিচ্ছিল হয়ে তৈরি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বাথরুমের পাশেই বেডে এবং মেঝেতেও রোগী ও স্বজনরা অবস্থান করছেন। দুর্গন্ধের কারণে তারা নাকমুখ চেপে থাকছেন। এ সময় দুপুরের খাবার দিতে দেখা যায় দায়িত্বরত এক ব্যক্তিকে; খাবারে ভাত, মাঝারি এক টুকরো মুরগি ও সবজি দেওয়া হয়। হৃদরোগ ওয়ার্ডে এক রোগীর স্বজন বলেন, “বাথরুমের গন্ধের কারণে হাসপাতালে টেকা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় থাকলে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ হতে দেরি হবে।
নিচে থাকা রোগীদের পাশ দিয়ে বাথরুমে যেতে হয়, কখন কখনও মেঝেতে থাকা রোগীর বেডে পা লাগে অনেকের।”১১ নম্বর ওর্য়াডের পুরুষ সার্জারি বিভাগে রোগীর চাপ অন্য ওর্য়াডের চেয়ে কম চোখে পড়েছে। তবে ওর্য়াডের মেঝে ও বাথরুমে ময়লা-আবর্জনা রয়েছে। বাথরুম থেকে দুর্গন্ধ ছাড়াচ্ছে।এ বিভাগে বড় ভাইকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে রয়েছেন এক ব্যক্তি। তার ভাইয়ের অপারেশন হয়েছে।তিনি বলেন, “সকালে ডাক্তার দেখে গেলে পরে প্রয়োজন পড়লে ডাক্তার ও নার্সদের বললে তারা আসেন। কোনো সময় একটু দেরিতে আসেন, কোনো সময় সঙ্গে সঙ্গে চলে আসনে। উনাদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে আরকি।’’১২ নম্বর ওয়ার্ডের গাইনি বিভাগেও একই চিত্র দেখা গেছে। দ্বিতীয় তলার লেবার ওটির বারান্দায় সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুকে নিয়ে বসে আছেন স্বজনরা। তাদের আশপাশেও পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। একই ভবনে থাকা চিকিৎসকদের ক্যান্টিনের চারপাশের মেঝেতেও ময়লা, পানের পিক ও প্লাস্টিকের কাপ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।হাসপাতালের নতুন ভবনের বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন তলায় রোগীরা দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে চিকিৎসক দেখাচ্ছেন। তবে চিকিৎসা সেবা চালু থাকলেও ভবনজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে চরম অবহেলা ও নোংরা পরিবেশ।ভবনটির তৃতীয় তলায় চর্ম-যৌন ও মানসিক বিভাগের ব্যালকনি সংলগ্ন টিনের ছাউনিতে জমে আছে ময়লার বিশাল স্তূপ। অন্যদিকে, একই ভবনের পুরুষ মেডিসিন বিভাগে গিয়ে দেখা যায় বাথরুমগুলোর স্যাঁতসেঁতে ও জরাজীর্ণ অবস্থা।