ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষেত্রে কোনো তাড়াহুড়া না করতে মধ্যস্থতাকারীদের নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
যে চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তাতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানো, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, আলোচনা গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে। তবে দুই পক্ষকেই সময় নিতে হবে ও সঠিকভাবে বিষয়টি সম্পন্ন করতে হবে।শনিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, চুক্তির “বেশিরভাগ অংশ” নিয়ে ইতোমধ্যে সমঝোতা হয়েছে।এরপরই জল্পনা-কল্পনা শুরু হয় যে এ নিয়ে দ্রুত কোনো ঘোষণা আসতে পারে।
সপ্তাহান্তে ইরানের কর্মকর্তারাও আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, দুই পক্ষ ‘চুক্তির খুব কাছেও আছে, আবার অনেক দূরেও আছে।’
অর্থাৎ, কিছু বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা এগোলেও এখনো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় থাকা এই সমঝোতা কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। বরং বেশ কিছু জটিল বিষয়কে পরবর্তীতে আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরিধি ও সময়, জব্দ করা ইরানি অর্থ ছাড় করা হবে কি না এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের সীমাবদ্ধতা চায়।
এই সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যেও মতভেদ দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলছেন, এতে ইরানের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়তা দেখানো হচ্ছে।সেনেটর টেড ক্রুজ এই সম্ভাব্য চুক্তিকে “ভয়াবহ ভুল” বলে মন্তব্য করেছেন।
আর সেনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটি’র চেয়ারম্যান রজার উইকার বলেছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি হলে ‘অপারেশন এপিক ফিউরির সব অর্জনই অর্থহীন হয়ে যাবে।’তবে এ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির রিপ্রেজেন্টেটিভ মাইক ললার বলেছেন, মার্কিন প্রশাসন ইরানকে ‘আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে পেরেছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক হামলা চালায়। এরপর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়।এ সময় ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। অথচ, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এর ফলশ্রুতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যায়।
এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কোনো চুক্তি চূড়ান্ত, অনুমোদিত ও স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত এই অবরোধ পুরোপুরি বহাল থাকবে।
রোববার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প আবারও বলেন, ইরানকে বুঝতে হবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। যদিও তেহরান বারবার দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুই শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
কিছু মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান শেষ পর্যন্ত তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে রাজি হতে পারে।ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়েছে। এটিকে আরও প্রক্রিয়াজাত করে অস্ত্র তৈরির উপযোগী ৯০ শতাংশ মাত্রায় নেওয়া তুলনামূলক সহজ বলে মনে করা হয়।
আর, সেই পর্যায়ে পৌঁছালে ইরানের পক্ষে পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বকে আশ্বস্ত করতে প্রস্তুত যে আমরা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছি না।’
আলোচনায় মধ্যস্থতা করা পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, সাম্প্রতিক আলোচনা দেখে মনে হচ্ছে ইতিবাচক কোনো সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং দুই পক্ষ একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।