বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০০ অপরাহ্ন

আমিরাতের ভিসা বাতিলে সর্বস্ব হারানোর শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / ৫১ মোট শেয়ার
হালনাগাদ : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আমিরাতের ভিসা বাতিলে সর্বস্ব হারানোর শঙ্কা

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছুটিতে গিয়ে আর ফিরতে পারছেন না কয়েক হাজার বাংলাদেশি। কোনো পূর্ব ঘোষণা বা কারণ না জানিয়ে তাঁদের ভিসা বাতিল করা হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে আমিরাতে বসবাস ও ছোট পরিসরে ব্যবসা করা বাংলাদেশিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, দেশে আটকে পড়লে দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও ব্যবসা হারাতে হতে পারে।প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভিসা বাতিলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশির সংখ্যা ৪ হাজার ৮০০। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। কারণ ভিসা বাতিল হওয়া অনেকেই অনলাইনে নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে পারেননি।

নেত্রকোনার আবুল কালাম তাঁদেরই একজন। ১৯৯৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে প্রায় ১২ বছর একটি মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে বেসরকারি মসজিদগুলো সরকারীকরণ হলে চাকরি হারান। এরপর কফিলের সহায়তায় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন।

গত ৭ এপ্রিল ছুটিতে দেশে আসেন আবুল কালাম। সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবার আমিরাতে ফেরার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু গত ২৪ জুলাই মুঠোফোনে একটি বার্তা পেয়ে জানতে পারেন, তাঁর ভিসা বাতিল করা হয়েছে। তবে কেন ভিসা বাতিল করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো কারণ জানানো হয়নি।আবুল কালাম বলেন, ‘আমি দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে আমিরাতে থাকছি। আমার সঙ্গে ছুটিতে আসা আরিফুল ইসলামেরও ভিসা বাতিল হয়েছে। আমি ছোট পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করছি। বর্তমানে একজনের কাছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। আমিরাতে ফিরতে না পারলে এ টাকা ফেরত পাওয়াও আমার জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।’

আরেক ব্যবসায়ী মানিক মিয়াও একই ধরনের সমস্যায় পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘২০০০ সাল থেকে আমি আমিরাতে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। দুটি কোম্পানিতে প্রায় ২০ জন কর্মী কাজ করেন। ছুটিতে দেশে আসার পর জুলাইয়ের ১৩ তারিখ আমার ভিসা বাতিলের মেসেজ পাই। কেন বাতিল হয়েছে কিছুই জানি না। আমার ভিসার মেয়াদ আছে আর ছয় মাস। এর মধ্যে যদি ফিরতে না পারি, তাহলে ২৬ বছরের পরিশ্রমের ব্যবসা সব শেষ হয়ে যাবে।’

১৯৭৬ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া শুরু হয়। একসময় দেশটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার ছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিক্ষোভের পর ৫৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয় ইউএই সরকার। এরপর বাংলাদেশিদের ভিজিট ও কর্মী ভিসা বন্ধ হয়ে যায়। পরে সীমিত পরিসরে ভিজিট ভিসা চালু হলেও কর্মী ভিসা পুরোপুরি চালু হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে বন্ধ শ্রমবাজার পুরোপুরি চালু হওয়ার আগেই ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীদের ভিসা বাতিলের ঘটনায় কর্মী ও ব্যবসায়ীরা নতুন করে বিপাকে পড়েছেন। আমিরাতে ফিরতে না পারলে তাঁদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৯৮ হাজার ৪২২ জন বাংলাদেশি কর্মী গিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪৭ হাজার ১৫৮ জনে। ২০২৫ সালে আরও কমে ১৩ হাজার ৭৫০ জনে নামে। চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমিরাতে গেছেন ১৯ হাজার ৬১৯ জন বাংলাদেশি।

বন্ধ শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল বলে জানিয়েছেন জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আমিরাতে ভিসা বন্ধ হয়ে গেলেও বর্তমানে আধা-সরকারি কিছু কোম্পানি ভিসার অনুমোদন পাচ্ছে, তবে সীমিত পরিসরে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আকর্ষণীয় শ্রমবাজারটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।’প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত চার হাজারের বেশি বাংলাদেশির ভিসা বাতিল হওয়ার বিষয়টি আমরা অবগত আছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি জানে। সমস্যাটি কূটনৈতিকভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’


এই বিভাগের আরো খবর