গ্যাস সঙ্কটের কারণে বন্ধ হয়ে পড়েছে হবিগঞ্জের ১৭১ টি শিল্প কারখানা। এতে রপ্তানিখাতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া বেকার হয়ে পড়েছেন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক।প্রায় ২০ দিন ধরে গ্যাসের সরবরাহ কম থাকলেও গত বুধবার থেকে অনেক শিল্পকারখানায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে জেলার ছোট-বড় ১৭১টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হবিগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান শতভাগ রফতানিমুখী। আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে রফতানিমুখী।
যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন জানান, পার্কটিতে টায়ার, স্পিনিং, ফেব্রিক্স, পেপার, পলি সিল্ক ও পাওয়ারপ্ল্যান্টসহ ছয়টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে টায়ার ও পাওয়ারপ্ল্যান্ট ছাড়া অন্যগুলো শতভাগ রপ্তানিমুখী। এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কর্মরত। তার দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ১৩ দশমিক ৬ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু কয়েক দিন ধরে মাত্র ৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। বুধবার রাত ১২টার পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের শাহজীবাজার আঞ্চলিক বিতরণ কার্যালয়ের প্রধান মো. খালেদ গনি জানান, হবিগঞ্জে দৈনিক প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ বাড়ানোর কারণে শিল্প খাতে সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্য, ২১ জুলাই থেকে সমস্যাটি শুরু হয়েছে এবং গত কয়েক দিনে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। তবে তাঁর দাবি, আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে গ্যাস না থাকায় সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাগুলো। উদ্যোক্তাদের দাবি, উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে অর্ডার বাতিল হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাদশা পাইওনিয়রের মহাব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) মো. খায়রুল আলম জানান, তাদের কারখানায় স্পিনিং, টেক্সটাইল ও গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন ইউনিট রয়েছে। কয়েক দিন ধরে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া গেলেও বুধবার থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
তার দাবি, এতে প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৬ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজের বাইরে রয়েছেন। সময়মতো উৎপাদন ও শিপমেন্ট করতে না পারলে কোটি কোটি টাকার রপ্তানি অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।সায়হাম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক জানান, ২২ জুলাই থেকে তাদের প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। কখনো চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ, কখনো এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া গেছে। বর্তমানে পুরো উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি।
তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২৭ হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা রয়েছেন। গ্যাসনির্ভর নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা থাকায় গ্যাস না থাকায় কারখানাগুলোতেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানাগুলোর উৎপাদন থেমে গেছে।
স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ বলেন, তাদের কারখানায় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কাজ করেন। শতভাগ রপ্তানিমুখী এই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারলে ক্রেতাদের কাছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চললে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। গ্যাস সংকটের পেছনে জাতীয় পর্যায়ের সরবরাহ ঘাটতিও বড় কারণ।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৬ সালের মার্চে দৈনিক স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে, যেখানে ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট।
ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসিক ও পরিবহন সব খাতেই এর প্রভাব পড়ছে। হবিগঞ্জের শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে উৎপাদন বন্ধ থাকার ক্ষতি আরও বাড়বে। একই সঙ্গে রপ্তানি অর্ডার, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে। তাদের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো নয়, শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে।