ভারতের দিল্লিতে সত্য নিকেতন এলাকায় ভবনধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ছয়জনে দাঁড়িয়েছে। রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে আরো একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো কেউ আটকে আছেন কি না, তা দেখতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।এএনআইয়ের প্রতিবেদনে জানা যায়, ঘটনাস্থলে ভারী ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা বাহিনী (এনডিআরএফ), দমকল বাহিনী, দিল্লি পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে থাকা ব্যক্তিদের খোঁজা হচ্ছে।
ভবনধসের পর দিল্লির ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পেইং গেস্ট হিসেবে ব্যবহৃত ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এসব ভবন নির্মাণের সময় নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভবনের নকশা অনুমোদন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম মানা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
কংগ্রেস নেতা ও সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির উত্তরাখণ্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা কুমারী সেলজা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে দিল্লির বিজেপি সরকারের সমালোচনা করেছেন।তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় অনেক শিক্ষার্থীকে পরিবার থেকে দূরে দিল্লিতে পাঠানো হয়। এসব শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। সেলজা বলেন, ‘বিজেপি সরকার কী করছে? কোচিং সেন্টারে যা ঘটেছিল, তারা তা ভুলে গেছে। দিল্লিতে একটি মাফিয়া চক্র চলছে। এই শিশুদের অনেক আশা নিয়ে বাড়ি থেকে দূরে পাঠানো হয়।
দিল্লির সাবেক মুখ্যসচিব ওমেশ সাইগাল ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, দিল্লিতে কয়েক মাস পরপরই এ ধরনের ঘটনা ঘটে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীন নির্মাণ নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সাইগালের অভিযোগ, কিছু ভবনের নকশা অনুমোদিত নয়। আবার কিছু ভবনে পরে অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত তলা তৈরি করা হয়েছে। কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও কাজ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ভবনের নকশা অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা এসব ভবনের নিরাপত্তা ঠিকভাবে পরীক্ষা করেছিলেন কি না।
সাইগাল বলেন, ‘দিল্লিতে কী ধরনের ভবন তৈরি হয়েছে, তা দেখুন। আমি বলব, কিছু এলাকায় প্রতি পাঁচটি ভবনের মধ্যে একটি অনুমোদনহীন। হয় ভবনের নকশা অনুমোদিত হয়নি, নয়তো পরে অতিরিক্ত তলা তৈরি করা হয়েছে। অথবা নির্মাণকাজ নিম্নমানের।’ অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ ও বেশি নির্মাণ হয়েছে—এমন এলাকায় নতুন ভবন নির্মাণে বিধি-নিষেধ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাইগাল। তিনি বলেন, এসব এলাকায় নতুন ভবনের নকশা অনুমোদন বন্ধ করার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে পুরোনো ভবনগুলোর নিরাপত্তাও পরীক্ষা করা দরকার। সাইগাল বলেন, ‘অন্তত এসব এলাকায় নতুন নির্মাণ বন্ধ করা উচিত। যেসব এলাকায় ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত ভিড় এবং বেশি নির্মাণ হয়েছে, সেখানে নতুন নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। অথবা নতুন ভবনের নকশা অনুমোদন বন্ধ করতে হবে। এসব বিষয়েই এখন নজর দেওয়া দরকার।’
সত্য নিকেতনে ভবন ধসের ঘটনাকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেছেন ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার (এনএসইউআই) সভাপতি বিনোদ জাখর। এএনআইকে তিনি বলেন, উদ্ধারকাজ চলছে এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ। উদ্ধার করা শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই মারা গেছেন বলে দাবি করেন তিনি। জাখর বলেন, উদ্ধারকারীরা শিক্ষার্থীদের বের করে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। প্রায় তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল বলেও জানান তিনি। তার অভিযোগ, চিকিৎসা সহায়তা, চিকিৎসক দল, পুলিশ ও দমকল বাহিনী যদি আরো দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাত এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে আরো শিক্ষার্থীকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারত।
জাখর বলেন, ‘বিজেপির কোনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নেই। আজ গোয়ায় দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বিজেপির একটি বিশাল কার্যালয় উদ্বোধন করছেন, তখন এখানে একটি ভবন ধসে পড়েছে। বিজেপির কার্যালয় কখনো ধসে পড়ে না। কারণ পেইং গেস্ট ও কোচিং সেন্টারের মালিকদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ দিয়ে সেগুলো তৈরি করা হয়।’ শিক্ষার্থীদের জন্য বিচার দাবি করে তিনি বলেন, এই ঘটনায় তাদের কয়েকজন সহকর্মীও গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় কারো জবাবদিহি নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে দিল্লি বিজেপির যুব শাখার সভাপতি রজত চৌধুরী জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখনো গুরুতর। তিনি দ্রুত উদ্ধারকাজ শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন। চৌধুরীর দাবি, ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসক রয়েছেন। আটকে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার নিশ্চিত করতে দিল্লি ও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক ইস্যু না করার আহ্বান জানিয়েছেন চৌধুরী। তার মতে, এখন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং উদ্ধারকাজে যুক্ত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানোই গুরুত্বপূর্ণ। চৌধুরী বলেন, ‘এটা রাজনীতি করার সময় নয়। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা কারও না কারও সন্তান। রাজনীতি না করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত। বিরোধীদের এটা করা উচিত নয়। তাদের মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’