শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৮ অপরাহ্ন

ফেরদৌস স্টিলে বিষাক্ত গ্যাসে ঝরল ৯ প্রাণ

ডেস্ক / ২০ মোট শেয়ার
হালনাগাদ : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
ফেরদৌস স্টিলে বিষাক্ত গ্যাসে ঝরল ৯ প্রাণ

নিরাপত্তা সামগ্রীর অনুপস্থিতি, অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে ওভারটাইম না দেওয়া এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন না করার অভিযোগে চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে মাসখানেক আগেই মামলা হয়েছিল। কিন্তু এর পরও থামেনি ঝুঁকি নিয়ে কাজ করানো। অবশেষে সেই চরম অবহেলা ও নিরাপত্তার ঘাটতির চূড়ান্ত মাশুল দিতে হলো ৯টি তাজা প্রাণ দিয়ে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ‘এমটি রাসি’ নামের এক স্ক্র্যাপ জাহাজের তলার ব্যালাস্ট ট্যাংক কাটার সময় বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

উদ্ধার করতে গিয়ে একের পর এক মৃত্যু
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কারখানাটিতে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত পুরোনো জাহাজটি কাটার কাজ চলছিল। কার্গো ট্যাংকের পাশে থাকা ব্যালাস্ট ট্যাংক (ভারসাম্য রক্ষার পানি রাখার স্থান) খোলার পরপরই ভেতর থেকে তীব্র বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে।

প্রথমে দুজন শ্রমিক সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে তাঁদের বাঁচাতে অন্য শ্রমিকেরা এগিয়ে যান। পরে তাঁদের উদ্ধারে ফোরম্যান ও মাস্ক পরিহিত নিরাপত্তা কর্মকর্তাও ট্যাংকে নামেন। এভাবে বিষাক্ত বাতাসের সংস্পর্শে এসে একের পর এক শ্রমিক অচেতন হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

দুর্ঘটনায় নিহত ৯ জন হলেন— সীতাকুণ্ডের আকবর আলীর হাটের দুই ভাই মো. মনসুর (৫৫) ও মো. নাছির উদ্দীন (৫১), পাবনার সুজানগরের মো. আব্দুল আলীম (৩৬), গাইবান্ধা সদরের মো. রানা মিয়া (২৩), সীতাকুণ্ডের খাদেমপাড়ার হাবিবুর রহমান (৫১), ভাটিয়ারীর পলাশ জলদাস (৩৫), সানি জলদাস (২৩), মতিউর রহমান (১৯) এবং গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের মো. খোকন মিয়া (২৩)।

নোটিশ ও মামলার পরও সুরাহা হয়নি
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের শ্রম পরিদর্শক শাহেদ পারভেজ জানান, গত ৯ ফেব্রুয়ারি ওই কারখানায় পরিদর্শন চালিয়ে শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন, সুরক্ষা উপকরণের অভাব এবং ওভারটাইম না দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। বারংবার নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও কারখানা কর্তৃপক্ষ কোনো ইতিবাচক জবাব না দেওয়ায় গত জুলাই মাসে শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলীকে আসামি করা হয়।

মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ চালু রাখায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত। তাঁর মতে, পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়া ও মামলা হওয়ার পরও সংশোধন না নিশ্চিত করে কাজ চালু রাখা দায়িত্বপ্রাপ্তদের মারাত্মক উদাসীনতার সামিল।

চিকিৎসায় বিলম্ব ও অব্যবস্থাপনা
দুর্ঘটনার পর কারখানায় জরুরি অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক কিংবা অক্সিজেন সিলিন্ডারের অভাব ছিল বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকেরা। অনেককে উদ্ধারের পরও সঠিক সময়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও অক্সিজেন না দেওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া সকাল ৯টার দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসকে জানানো হয় ঘটনার প্রায় দুই ঘণ্টা পর, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে।

কর্তৃপক্ষের দাবি ও তদন্ত
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলী অবশ্য নিরাপত্তার ঘাটতি ও মামলা সম্পর্কিত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, শ্রমিকেরা নিছক উদ্ধার চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত আক্রান্ত হয়েছেন। নিহতদের আইন অনুযায়ী সব ধরনের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়েই শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সঠিক কারণ ও গাফিলতি চিহ্নিত করতে ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।


এই বিভাগের আরো খবর